সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি::

সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের শিরাজপুর বাগঁগাও গ্রামের নিজ বাড়িতে জাহেদা বেগম(২৭) নামের দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বামী ও স্বামীর পরিবারের দাবি, গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তার স্ত্রী। এদিকে নিহত জাহেদার পরিবারের দাবি, আত্মহত্যা নয়, জাহেদাকে হত্যার পর নিজেদের বাঁচাতে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে স্বামীর পরিবারের লোকজন। শুধু তাই নয়! বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই তার স্বামী আব্দুল্লাহ ও দেবর আবুল হাসান প্রায় মারধর করতেন জাহেদা কে এমন অভিযোগও নিহতের পরিবারের লোকজনের ।

 

ঘটেছে গতকাল (৮ জুন বুধবার) সকালে নিহত গৃহবধূর স্বামীর বাড়ি শিরাজপুর বাগঁগাও গ্রামে। পরে আত্মীয়-স্বজনদের খবরে ঘটনার স্থল থেকে ওই গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে বিশ্বম্ভরপুর থানা পুলিশ।

 

পরিবার ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুই পরিবারের সম্মতিতেই ২০১৭ সালের ১৯ মে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের শিরাজপুর বাগঁগাও গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফের ছেলে আব্দুল্লাহ (৩৫) এর সাথে তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বাদাঘাট ইউনিয়নের ইছবপুর গ্রামের মোহাম্মদ হায়াত উল্লার মেয়ে জাহেদা বেগম(২৭) এর বিয়ে হয়। এরই মধ্যে তাদের সংসারে আসে এক ছেলে ও এক মেয়ে। দুই সন্তানের মধ্যে ১ বছর ২ মাসের ছেলে ও মেয়ে বয়স আড়াই বছর।

 

নিহতের বাবা হায়াত উল্লা সংবাদকে বলেন, বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিভিন্ন কারণে নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। পান থেকে চুন খসার মতো কিছু ঘটলেই স্বামী আব্দুল্লা মারধর করতো জাহেদাকে। শুধু তার স্বামীই না স্বামী আব্দুল্লার তো মারধর করতো সাথে জাহেদার দেবর আবুল হাসানও মারধর করতো জাহেদাকে। আমার মেয়ে আত্নহত্যা করার মেয়ে না। স্বামী দেবরের এতো অত্যাচারের পরেও যে আত্নহত্যা করেনি সে এখন আত্নহত্যা করবে কেন। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।

 

 

নিহত জাহেদার ভাই নবী হোসেন মাষ্টার বলেন, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন কারণে জাহেদার উপর চালাতো স্বামী দেবরের অমানবিক নির্যাতন। জাহেদার দেবর আবুল হাসানের চরিত্র ভালো ছিলনা। আবুল হাসান জাহেদাকে প্রায় সময় কুপ্রস্তাব দিতো এবং উত্তপ্ত করতো বলে জাহেদা আমাদের প্রায় সময় জানাতো। জাহেদা মরার আগের দিন(৭ জুন মঙ্গলবার) আবুল হাসান জাহেদাকে কুপ্রস্তাব দিলে তা ফোনে আমাদের জানায় জাহেদা। এই কথা জাহেদার দেবর আবুল হাসান শোনার পর আমাদের বাড়ির নাম্বারে ফোন দিয়ে আমার ছোট বোনকেও গালাগালি করে। পরে তার স্বামী আব্দুল্লা সন্ধ্যায় বাড়ি আসলে আবুল হাসানের এইসব বাজে কথাবার্তা ও আমাদের বাড়িতে ফোন দিয়ে গালাগালির বিষয়টি স্বামী আব্দুল্লাকে জানায় জাহেদা । এ সময় আব্দুল্লা তার ভাই আবুল হাসানের বিচার না করে উল্টো তার ভাই আবুল হাসানের কথায় আব্দুল্লা ও আবুল হাসান দুজনেই মিলে মারধর করে জাহেদাকে। তাদের মারধর ও অত্যাচার সইতে না পেরে ওইদিন রাতেই দুই সিন্তান রেখে বাড়ির পাশ্ববর্তী একই গ্রামে তাদের উকিল শ্বশুর জাবেদের বাড়ি চলে যায় জাহেদা। রাতেই বিষয়টি তার উকিল শ্বশুর ফোনে আমাদের জানালে তার দুই সন্তানের কথা ভেবে জাহাদাকে বোঝিয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে দিয়ে আসার কথা বলি। এবং সকালে জাহেদার শ্বশুর বাড়িতে আসার কথা বলি আমরা । এরই মধ্যে সকালে আমাদের ফোনে জানানো হয় জাহেদা আত্নহত্যা করে মারা গেছে। এটা কি করে সম্ভব। এটা আত্মহত্যা নয় জাহেদাকে মার্ডার করা হয়েছে। ওর শরীরে আমি মারধরের দাগ দেখেছি, যা আগে দেখিনি। সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে যেন বিচার করা হয়। তারা হত্যার পর নিজেদের বাঁচাতে আত্নহত্যা নাটক সাজিয়েছে।

 

এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার সরেজমিনে শিরাজপুর বাগগাও গেলে সাংবাদিক দেখেই জাহেদার স্বামীর আব্দুল্লা পালিয়ে যায়। পরে অনেক চেষ্টার পর জাহেদার শ্বশুর আব্দুর রউফের সাথে কথা বলতে সক্ষম হই।

এ সময় জাহেদার শ্বশুর বলেন, আমাদের পরিবারের কোন ঝগড়া ছিলনা। তবে বউয়ের( জাহেদার) মাথায় কিছু সমস্যা ছিল। অনেক সময় পাগলের মতো ব্যবহার করতো, ভাত খেতনা, কামকাজ করতে চাইতো না। বউ প্রতিদিন সকালে আমারে নাস্তা দিত। কিন্তু আজকে ( বুধবার) সকালে নাস্তার জন্য বউকে ডাকাডাকি করলেও সে কথা না বলে চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ বউ ঘরের বাহিরে চলে যায়। পরেই ঘরের বাহির হইয়া বউকে( জাহেদাকে) না দেখে অনেক্ক্ষণ ডাকাডাকি করে না পেয়ে সবাই মিলে আশপাশের ঘরে খোঁজাখোঁজি করি। সেখানেও না পেয়ে সামনে নতুন ঘর বানতাছি এই ঘরে গিয়ে দেখি ঘরের চালের হেঙ্গলের সাথে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছে। পরে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন এসে রশি কেটে নিচে নাই। এ সময়ও তার দম আছিন। জাহেদা আত্নহত্যা করেনাই হত্যা করে তাকে রশিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এমন অভিযোগ জাহেদার ভাই ও তার পরিবারের লোকজনের এমন প্রশ্ন করলে শ্বশুর আব্দুর রউফ বলেন, আমরা বউকে হত্যা করব কেন, আমার এতো আদরের বউ, দুইটা নাতিও আছে। আমাদের তো কোন ঝগড়া ছিলনা। তারা যা বলছে সব মিথ্যা। বাবারে সবাই একদিন মরতে হবে।

 

এ ব্যাপারে বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি তদন্ত এসআই আব্দুর রহমান বলেন , খবর পেয়ে ঘটনার স্থলে গিয়ে মাটিতে শোয়া অবস্থায় ওই গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গতকাল বুধবার ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের লাশ তার পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মালাও হয়েছে। এখন যদি নিহতের পরিবারের লোকজন হত্যার অভিযোগ তুলে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে হত্যা না আত্নহত্যা। হত্যা হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।#

আমির হোসেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published.