ক্রমেই অবনতি হচ্ছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির। সড়ক তলিয়ে সারা দেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও বৈদ্যুতিক খুঁটি তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। এতে দুই জেলার অন্তত দুই লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।

শুক্রবার দুপুরে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

শুধু তাই নয়, পানি বাড়তে থাকায় সিলেট নগরের কুমারগাঁও ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই কেন্দ্র পানিতে ডুবলে পুরো সিলেট জেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে যাবে।

 

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাসাবাড়ির মিটার পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নগরের উপশহর এলাকায় এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। দক্ষিণ সুরমা বিদ্যুতের সাবস্টেশনে পানি ওঠায় পুরো দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।

 

সিলেটের চার জেলায় পিডিবির অধীন প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহক আছেন। এর মধ্যে সিলেটের ১ লাখ এবং সুনামগঞ্জের ৯০ হাজার গ্রাহক বর্তমানে বিদ্যুৎহীন আছেন।

 

সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২-এর জেনারেল ম্যানেজার দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী ও সঞ্জীব কুমার রায় জানান, সমিতির সিলেট-১-এর অধীনে থাকা ৪ লাখ ১৩ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক এবং সিলেট-২-এর অধীনে থাকা ২ লাখ ১২ হাজার গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ৯০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন আছেন।

 

বিউবোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামছ-ই-আরেফিন বলেন, বন্যার অবনতি হওয়ায় অনেক স্থানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

 

সিলেট নগরের কুমারগাঁও ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের ভেতরেও বন্যার পানি ঢুকেছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ ছুঁইছুঁই করছে বন্যার পানি। পানি বেড়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভেতরে ঢুকলে সিলেট জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান বিউবোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

বিউবো সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কাদির শুক্রবার বলেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। এমনভাবে চললে নিয়ন্ত্রণকক্ষে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা আছে। এতে পুরো সিলেট জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

 

বন্যায় সুনামগঞ্জ শহরের অবস্থা সব চেয়ে বেশি খারাপ। রাস্তাঘাট ডুবে যাওযায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জ। অফিস আদালত, বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। মানুষজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

 

এদিকে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

 

সব চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা সুনামগঞ্জ শহরে। এখানে অফিস আদালত, বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ পুরো শহর বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্যায় সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের গোবিন্দগঞ্জ-দিঘলী এলাকা প্লাবিত হয়ে সারাদেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আন্তঃজেলা যোগাযোগ ব্যবস্থাও। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। কার্যত এখানকার লোকজন এখন গৃহবন্দি।

আকস্মিক বন্যায় সিলেট নগরের উপশহর, সোবহানীঘাট, মেন্দিবাগ, মুরাদপুর এবং নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাই গ্রাহকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছে সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ। আর সিলেটে পর্যাপ্ত নৌকা ও উদ্ধারকর্মী না থাকায় পানিতে আটকেপড়া মানুষ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত নৌকা ও উদ্ধার সরঞ্জামাদি না থাকায় জেলা প্রশাসক সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে।

 

সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন। তিনি জানান, বন্যার পানিতে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ-দিঘলী এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। সেখান দিয়ে কোনো দূরপাল্লার গাড়ি আপাতত যেতে পারবে না। তবে ছোট যানবাহন, মোটরসাইকেল চলতে পারবে।

 

পাউবো হাইড্রাওলজি বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সত্যেন্দ্র চন্দ বৈদ্য ঢাকা টাইমসকে জানান, শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে সুনামগঞ্জে। সেখানে ৩৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

 

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামস-ই আরেফিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আকস্মিক বন্যার কারণে উপশহর, সোবহানীঘাট, মেন্দিবাগ, মুরাদপুর এবং আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যে কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পানিতে কোনো বৈদ্যুতিক তার, খুঁটি বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি পড়ে থাকলে কিংবা গাছপালা বৈদ্যুতিক লাইনে পড়লে স্পর্শ না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত বিউবো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২–এর দপ্তরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don`t copy text!
%d bloggers like this: